তামাক-জুয়ার সঙ্গে ভিডিও গেমের তুলনা কতটা যৌক্তিক?

ছবি: সংগৃহীত

 

 

নিজস্ব প্রতিনিধি:

 

 

তামাক বা জুয়ার সঙ্গে তুলনা কোনো জন্যই শিল্পের জন্যই সুখকর নয়। কিন্তু ভিডিও গেমের ক্ষেত্রে ঠিক এটিই হচ্ছে। বহু বছর ধরে অভিভাবকরা অভিযোগ করে আসছেন, তাদের সন্তানেরা প্লে-স্টেশন বা স্মার্টফোনে ‘আসক্ত’। এই শব্দটি আজকাল চিকিৎসকরাও ব্যবহার করতে শুরু করেছেন। গত ১ জানুয়ারি ‘গেমিং ডিজঅর্ডার’ শব্দটির স্বীকৃতি দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), যার অর্থ- ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও অতিরিক্ত গেম খেলা। এর মাত্র কয়েক মাস আগে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গেমিং বাজার চীন এ বিষয়ে কঠোর বিধিনিষেধ জারি করেছে।

 

 

 

 

 

 

নতুন নিয়মানুসারে, দেশটিতে শিশুরা কেবল শুক্র, শনি ও রোববার এক ঘণ্টা করে অনলাইন গেম খেলতে পারবে। সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে তাদের জন্য এই খেলা পুরোপুরি নিষিদ্ধ। পশ্চিমা রাজনীতিবিদরাও প্রকাশ্যে কিছু অনলাইন গেমের সঙ্গে জুয়ার সাদৃশ্য থাকা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। এই ‘আসক্তি’ থেকে মুক্তি দিতে সারা বিশ্বে ক্লিনিকগুলোর তৎপরতা বাড়ছে। তারা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, যেভাবে অ্যালকোহল বা কোকেনের আসক্তি সারানো হয়, সেভাবে গেমের ‘আসক্তি’ও ছাড়িয়ে দেবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, অনলাইন গেম কি সত্যিই আসক্তি-সৃষ্টিকারী? মনোবিজ্ঞানীরা এ নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত। গেমের পক্ষের লোকদের দাবি, এটি আরেকটি নৈতিক উদ্বেগ ছাড়া কিছু নয়। অতীতের ‘আনন্দহরণকারীরা’ টেলিভিশন, রক ‘এন’ রোল, জ্যাজ, কমিক বই, উপন্যাস, এমনকি ক্রসওয়ার্ড পাজলের বিষয়ে একইভাবে সতর্কতা জারি করেছিল।

 

 

 

 

 

 

পক্ষপাতীদের আরও অভিযোগ, গেমিং আসক্তি নির্ণয়ে ব্যবহৃত মানদণ্ডগুলো খুবই সাধারণ। তাদের মতে, অতিরিক্ত গেম খেলা কোনো ব্যাধি নয়, এটি বিষণ্নতার একটি উপসর্গ হতে পারে। তবে গেমিং বিরোধীদের মত, অনলাইন গেম রক ব্যান্ড বা উপন্যাসের মতো নয়। গেম নির্মাতাদের কাছে তাদের পণ্যগুলোকে অপ্রতিরোধ্য করে তোলার উদ্দেশ্য এবং উপায় উভয়ই থাকে। আর এই উদ্দেশ্য আসে একটি ব্যবসায়িক মডেল থেকে। আগে এককালীন খরচে গেম কেনা হতো। এখন অনেকে ‘ফ্রিমিয়াম’ মডেল ব্যবহার করে, যেখানে গেম পাওয়া যায় বিনামূল্যে, কিন্তু এটি খেলার ভেতরে নানা পণ্য কিনতে অর্থ খরচ করা লাগে।

 

 

 

 

 

 

 

এতে ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি খেলার সময়ের সম্পর্ক তৈরি হয়। আর গেম নির্মাতারা মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্ব এবং তথ্য ব্যবহার করে সেই সময়কে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিতে উদ্বুদ্ধ করেন। দীর্ঘদিনের গবেষণায় মনস্তাত্ত্বিকরা এরই মধ্যে অনেক কিছু জানেন, যা ফলপ্রসূ হতে পারে। স্মার্টফোন এবং আধুনিক কনসোলগুলো স্থায়ী ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করে সব গেমপ্লে ডেটা ডেভেলপারদের কাছে পাঠিয়ে দেয়। এটি গেমগুলোতে ক্রমাগত সংযোজন-পরিমার্জনসহ খরচ বাড়াতে প্রেরণা দেয়। তাছাড়া, গেমিং শিল্প এরই মধ্যে জুয়া ব্যবসায় ব্যবহৃত নানা শব্দও ব্যবহার করা শুরু করেছে। গেমে সবচেয়ে বেশি খরচকারীদের ‘হোয়েল’ (তিমি) নামে ডাকা হচ্ছে, যে শব্দটি সাধারণত ক্যাসিনোতে ব্যবহার হয়।

 

 

 

 

 

 

 

যদিও, ঠিক কোন পর্যায়ে গেলে সেটিকে আসক্তি ধরা হবে এবং অনলাইন গেমিংয়ের কৌশলগুলো সেই সীমা অতিক্রম করে কিনা তা নিয়ে মনোবিজ্ঞানীদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে; তবে এটি সবারই স্বীকার করা উচিত যে, বিশ্বে এই সমস্যা বাস্তব এবং সেটি ক্রমেই বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছ থেকে গেমিং আসক্তির নতুন নাম পাওয়ার পর এবার এর চিকিৎসা আরও স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। লকডাউন গেমারদের আরও বেশি গেম খেলার সুযোগ করে দেওয়ায় ক্লিনিকগুলোতে এরই মধ্যে দৌড়ঝাঁপ বাড়তে শুরু করেছে। প্রযুক্তি খাতে বিধিনিষেধ কঠোর হচ্ছে। তবে গেম নির্মাতাদের এটি অবশ্যই মনে রাখতে হবে, জুয়া ও তামাকের সঙ্গে তুলনা এই শিল্পের কোনো উপকার করবে না।

সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *