‘আগের দামে ডিজেল দিন, সময়মতো ধান কিনে নিন’
নিজস্ব প্রতিবেদক :জ্বালানি খাতে সরকার ভর্তুকি তুলে নিলেও দেশের কৃষিখাত বাঁচাতে ডিজেলে ভর্তুকি দিয়ে হলেও কৃষককে আগের দামে ডিজেল দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুক। একইসঙ্গে কৃষকের কাছ থেকে আগামী মৌসুমে দুই সপ্তাহের মধ্যে ন্যায্যমূল্যে ধান কিনে নেওয়ার বিষয়ে সরকারকে আগাম ঘোষণা দেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি। অন্যথায় কৃষক লোকসানে পড়ে উৎপাদন থেকে সরে আসবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।বুধবার (১০ আগস্ট) সেন্টার ফর পলেসি ডায়ালগ-সিপিডি আয়োজিত ‘জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এড়ানো যেতো কি না’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।আনোয়ার ফারুক বলেন, ১৫ লাখ ইকুইপমেন্ট আছে। এর মধ্যে ডিজেলচালিত মেশিনগুলোকে ভর্তুকিমূল্যে তেল দিতে হবে। অন্যথায় কৃষক বিপদে পড়বে। অন্য খাতে ভর্তুকি উঠিয়ে নিলেও কৃষিতে ভর্তুকি দিতেই হবে। এর কোনো বিকল্প উপায় নেই। সেটা সার হোক বা ডিজেল। ১৭ কোটি মানুষকে তো আর দিতে হবে না, ১৫ লাখ মেশিনকে দিলেই হবে। তেলের ঊর্ধ্বমূল্য কৃষকের ঘাড়ে যেন চাপানো না হয়।সাবেক এ কৃষি সচিব বলেন, তেলের দাম বাড়ানো এড়ানো যেতো। ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কোনো যৌক্তিকতা নেই। ঠিক আছে বুঝলাম, ভর্তুকি তুলে নেবেন। তাহলে ট্যাক্সও কম নেন।
একটু এডজাস্ট করেন। কারণ কোভিড-১৯ পরবর্তী আমাদের সে অবস্থা আসেনি, যে অবস্থায় আমাদের তেলের মূল্য হঠাৎ করে এতোটা বাড়াতে হবে। আমাদের সরকারের ক্ষেত্রে যেটা ঘটে, একবার দাম বাড়ালে সরকার আর তা কমায় না। লাভ করতেই থাকে। ২০১৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ৪৬ হাজার কোটি টাকা লাভ করলো বিপিসি (বাংলাদেশ পেট্রলিয়াম করপোরেশন)। তখন তো আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম শূন্যের কোটায় ছিলো। তখন তো দেশের বাজারে দাম কমানো হয়নি।কৃষিখাতে তেলের দামের প্রভাব নিয়ে তিনি বলেন, সরকার দাম বাড়িয়েছে, কিন্তু কৃষিখাতের জন্য কোনো দিকনির্দেশনা দেয়নি। আমরা কিন্তু এখনো অনেক খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। আমি যদি কৃষিতে কী প্রভাব পড়বে সেদিক যাই, তাহলে প্রথম প্রভাব হলো আমার উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে।তিনি আরও বলেন, আমরা বোরো মৌসুমে ৬০ শতাংশ ধান বা চাল পাই। আমাদের ধানের মূল উৎপাদন কিন্তু বোরো মৌসুমেই হয়। দেশে বিভিন্ন ধরনের ১৫ লাখ ৭৪ হাজার সেচ টিউবওয়েল আছে। এর মধ্যে ১৩ লাখের বেশি অর্থাৎ ৭০ শতাংশ ডিজেল চালিত। এ মুহূর্তে এক বিঘা জমিতে সেচ খরচ গড়ে দেড় হাজার টাকা। তার ওপর ডিজেলের নতুন দাম যোগ হলে সেটা বেড়ে দুই হাজারে দাঁড়াবে। কিছুদিন আগে ইউরিয়া সাড়ের দাম বাড়ানো হয়েছে। এ কারণে আগে যা ছিলো তার সঙ্গে ২০০ টাকা দাম যোগ হবে। সাড়ে খরচ হবে ৭০০ টাকা। আমরা ৫৭ শতাংশ জমি পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টরের মাধ্যমে চাষ করি। সেখানেও ৯৭ শতাংশ ডিজেলেই চলে। সেখানেও আরও ৩০০ টাকা বেড়ে যাবে। তাহলে আমরা দেখছি, বিঘাপ্রতি বোরো চাষে ন্যূনতম এক হাজার টাকা খরচ বাড়বে।সাবেক কৃষি সচিব বলেন, আগামী মৌসুমে যদি ৪৭ বা ৪৮ লাখ হেক্টর জমি চাষ করেন, তাহলে ন্যূনতম ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা কৃষকের অতিরিক্ত খরচ হবে। এজন্য কৃষকের পুঁজি লাগবে। এ টাকা আসবে কোথা থেকে। ক্রেডিট সিস্টেমের কথা যদি বলি, আমাদের কৃষক ক্রেডিট সিস্টেমে ঢুকবে কোথা থেকে।কৃষক অনুদান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ৫ হাজার কোটি টকা কৃষকদের অনুদান দেওয়ার কথা বলেছেন। তার ১০ শতাংশও কোনো কৃষক পায়নি। কারণ, কৃষকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই।সরকারের ধান সংগ্রহ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কৃষক কম দামে ধান বিক্রি করে বেশি দামে চাল কিনে খায়। এজন্য সরকারের উচিত সংগ্রহ পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা। এপ্রিলের ১৫ থেকে জুনের ১৫ তারিখ সরকারকে প্রিমিয়াম প্রাইসে ধান কিনতে হবে। এতে কৃষকরা ৪০ থেকে ৫০ লাখ টন ধান বেশি উৎপাদন করে দেবে। এজন্য সরকারকে এখনই ধানের দাম ঘোষণা করতে হবে। তাহলে কৃষক উৎসাহিত হবে।আলোচনায় স্বাগত বক্তব্য দেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *